অগ্নিদর্পণ
-Mainak Biswas
________________________________________________________________________
মানুষ আয়নাতে তার প্রতিবিম্ব দেখে | সে কি দেখে ? চুলদাড়ি
চেহারা ব্যবহারিক জীবনের অঙ্গ | আর কিছু কি সে দেখে ?
আমার পিসি স্বাধীনতা
সংগ্রাম হয়তো দেখেননি কিন্তু 1971 এর যুদ্ধটা দেখেছিলেন | আমাদের গ্রাম থেকে বাংলাদেশের
সীমানা ছিল 5 কিলোমিটার | মিলিটারি ট্রাকের যাওয়া আসা এবং মিলিটারি বুটের আওয়াজ গ্রামের
নিস্তব্ধতা ভেঙে দিত | মাঝেমধ্যে ওই ট্রাকগুলোতে ভারতীয় পাকিস্তানি সেনাদের লাশ ও
আসত | গ্রামের মেঠো রাস্তা কালচে শুকিয়ে যাওয়া রক্তে কালো হয়ে উঠতো | যাই হোক সে
আলাদা গল্প | বাঙালির একটা বড় সমস্যা আছে | সমস্যা হচ্ছে মাটির উর্বরতা | এই মাটি
মানুষকে স্বার্থান্বেষী করে তোলে | অমুক গ্রামে কোন বাড়ির গরু চুরি হলো তাতে কোনো
চিন্তা নেই | আমার ডাল ভাত তো জোগাড় হয়ে যাচ্ছে | তাই এই জাতিতে কোন লোক উল্টো রাস্তায় হাঁটলে, সে
কিংবদন্তি হয়ে ওঠে | আমার পিসি সেই জাতের মধ্যে ছিলেন | যুদ্ধ তার মধ্যে গভীর প্রভাব
ফেলেছিল | ধর্মের জন্য মারকাট তিনি পছন্দ করেননি | আমাদের বাড়ি থেকেও পূর্ববঙ্গের
আত্মীয়দের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল | যখন সারা দেশজুড়ে বাঙ্গালীদের মরাকান্না, বাচ্চাদের
ক্ষুধা এবং মৃত্যু তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তিনি নিজের লড়াই শুরু করলেন | তিনি নকশাল
আন্দোলনে যোগ দিলেন | পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন পাঠক | গ্রামের আমার ঠাকুরদার আট সন্তানের
তৃতীয় কন্যা সন্তান খিদের জ্বালায় বিপ্লব শুরু করলেন বাংলা ও অবিভক্ত বিহারে | পাঠকরা
হয়তো অনেকেই জানবেন না যে আজকের বিহার, ঝাড়খণ্ডের বেশিরভাগ গ্রাম কিন্তু বাঙালি
| রাজনৈতিক জাগরণের অভাবে বাঙালি আজ ভাষাহারা জমিহারা এক জাতিতে পরিণত হচ্ছে | যাইহোক
পিসির গোপন ডেরায় ঘোরা শুরু হলো | আমার পিসির সাথে আরেক যুবক বাড়ি ছেড়ে ছিলেন |
তিনি পরে পিসির সাথে বিবাহ সূত্রে আমার পিসেমশাই হলেন | তা এই যুবক-যুবতী বিপ্লব ছড়াতে
পুরো দেশে ঘুরে বেড়ালেন | পুলিশের হাত থেকে কোনোক্রমে বেঁচে ছিলেন | পিসি আমার অল্প
সাজতেন | তাই তিনি ব্যবহারের জন্য ছোট একটি আয়না রেখেছিলেন | সেই আয়না পুরো সত্তরের
দশক তার সঙ্গী ছিল | বড় আয়না কিনেছিলেন বহু বছর পরে | পশ্চিমবঙ্গে লাল শাসন আসার
পরে | পিসি পিসেমশাই-কে নিয়ে গ্রামে ফিরলেন | বহুদিনের গ্রামছাড়া মেয়েকে গ্রামের
মানুষ আপন করে নিল | শুরু হলো নতুন যুদ্ধ | বর্গাদার অধিকারের আন্দোলনে মেতে উঠলেন
| নিজেদেরই জমি দান করে দিলেন | সবকিছু শেষ করে দিচ্ছিলেন, ঠাকুরদার চেষ্টায় চাকরিটা
পেলেন বলে শেষরক্ষা হলো | স্কুল মাস্টারের চাকরি পেলেন | একটি জিনিস তিনি লক্ষ্য করলেন
যে ইংরেজি শিক্ষা না হলে গ্রামের ছেলে মেয়েরা পিছিয়ে পড়বে | বললেন তিনি শহরে গিয়ে
কমরেড-দের | একটা জিনিস ভুলে গেছিলেন | সেটা ছিল তার পদবী "মন্ডল "| চাষা
| তাই ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চবর্ণের কমরেড তাকে বললেন যে চাষার ইংরেজি শিখে কি হবে | পিসি
আহত মনে গ্রামে ফিরে এলেন | বুঝলেন বিপ্লব মহান চিন্তা হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা শাসনের
আসনে বসেছে | অতএব শিক্ষা হোক | বাংলাতেই হোক | একদিন এই চাষার মেয়ের সন্তানেরা জাগবে
| ব্রাহ্মণ্যবাদী কমরেডরা ক্রমে ক্রমে বাঙালি চাষা মজুরদের হাতে তৈরি কল কারখানা বন্ধ
করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উইপোকার ঢিবি খুলে বসলেন | পিসির ছেলে ততদিনে বড় হয়ে
PhD পরীক্ষায় কোন ক্রমেই পাস করতে পারলেন না | অথচ সারা জীবন, পিসির মতো লাল রঙের সাথে যুক্ত ছিলেন | অনেক চেষ্টায়
স্কুলে মাস্টারি পেলেন | পিসির বয়স বাড়ছে,
উপলব্ধি তার থেকে বেশি বাড়ছিল | একটা
উপলব্ধি ছিল যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী কমরেডরা শুধু পুথি সর্বস্ব
জ্ঞান দিয়ে পুরো রাজ্যজুড়ে একটি অংক ভিত্তিক বিপ্লবের চেষ্টা করছেন | এবং এই অংক
ভিত্তিক বিপ্লবে এই চাষা মজুরদের বারুদ হিসেবে ব্যবহার করছেন | এই ব্রাহ্মণ্যবাদী কমরেডরা তাদের সন্তানদের ইংরেজি
মিডিয়াম স্কুল গুলোতে পড়ালেও অনাথ হত চাষী মজুরদের ছেলেমেয়েরা | এর আরেকটা সুবিধা
হলো যে সরকারি চাকরি, শিল্পে এবং ব্যবসাতে একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী পরিবারতন্ত্র আনা গেল
| সন্ধ্যেবেলা মজলিসে ব্রাহ্মণ্যবাদী কমরেডরা শ্যাম্পেন ও গোমাংস খেতে খেতে জমি-বাড়ি
আর লাশের বকরা ভাগ করে নিতেন |
রিজার্ভেশন না হলে
হয়তো এই দেশের সাঁওতাল ও দলিতরা মারা যেত | এই উপলব্ধির সাথে সাথে মাক্স এর পাশে পাশে
পিসি রানী রাসমণি ও আম্বেদকর এর ছবি রাখা শুরু করলেন | তিনি সহজেই অনুধাবন করলেন যে
ওবিসি রিজার্ভেশন চাষা, মজুর, সদগোপ ও তেলিদের কতটা প্রয়োজন |
পিসি আজকাল বড়
আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবেন যে তার ফর্শা চামড়া মাঠে-ঘাটে আন্দোলন করতে করতে কালো হয়ে
গেল কিন্তু আজ চাষার ছেলে শিক্ষিত হয়ে মজুরের কাজ করতে রাজ্যের বাইরে যাচ্ছে | তিনি
আবার সেই পুরনো খিদেটাকে টান টান অনুভব করতে থাকেন |
No comments:
Post a Comment