যারা স্কুল কলেজ আইটি সেক্টর বিভিন্ন বাণী বিপণন বাণিজ্যিক বা সরকারি সংস্থায় কাজ করে, তারা কি মাঝেমধ্যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাইরে তাকায়? দেখতে পায় যে সকালবেলা সাউথ লাইনের লোকালের কামরায় বোঝাই হয়ে মানুষ ছুটছে কলকাতায় কারো বাড়িতে জিগরি করতে, অথবা সিকিউরিটি গার্ড , দোকানের মজুর বা কোন ছোট দোকানদার, মুচি, মেথর, বা ড্রাইভার এর কাজ করতে ? না তারা দেখেনা | কিন্তু তাদের সেবা নেয় | জিজ্ঞেস করে কি দিনে দু'মুঠো ভাত খেতে পেরেছে কিনা? না করে না !! হয়তো সেবা নিয়ে যৎসামান্য টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু তার সাথে একরাশ ঘেন্নাও সাথে দেওয়া হয় | প্রশ্ন উঠছে ঘেন্নাটা কেন হয়?
ভারতীয় সমাজের এক অদ্ভুত অবস্থা হচ্ছে এই জাতি ব্যবস্থা | একটি শিশু জন্মাতেই এর শিকার হয় | এই দ্বিতীয় প্রবাহের মানুষেরা যে আমাদেরই লোক সেটা এই জাতি ব্যবস্থা ভুলিয়ে দেয় | আমরা কি দ্বিতীয় প্রবাহের মানুষদের চিনি ? জানি কি এদের ইতিহাস? হয়তো চার পাঁচ বছর হাজার বছর আগে এরাও কোন রাজবংশ থেকে উদ্ভূত ?
না
এদের কোন ইতিহাস নেই | থাকলেও সেই ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে, গোলামীর প্রথম শর্ত পূরণ করার জন্য | আচ্ছা কারা এই বাংলার দ্বিতীয় প্রবাহ ? এদের জাতি পরিচয় আগে আমাদের জানতে হবে। এই মানুষদের সিংহভাগই হচ্ছেন মাহিষ্য, কৈবর্ত, তেলি, সদগোপ, বাউরী, বাগদি, কর্মকার নমঃশূদ্র, নাপিত, হরিজন ইত্যাদি। এই মানুষজন আজ নিজেরাই ইতিহাস বিমুখ | এদের আজ ভারতের ও দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে শুধুমাত্র ভোট বাক্স হিসেবে দেখা হয়। এদের নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিরা কিছু টাকা ও সুবিধার পরিবর্তে এদের বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব কে বিক্রি করে। এখানে চেষ্টা করব এবং আধুনিক ভারতবর্ষের প্রথম ৫০ বছরে কিভাবে এদের ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে | এই জাতিরা কি বিরোধ করেনি ? বিপ্লবের চেষ্টা করেনি? করেছে | কিন্তু যতবারই মুখ তুলেছে। ততবারই গণহত্যা, ধর্ষণ এবং সরকারি অস্পৃশ্যতা মধ্যে তাদের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। এই শক্তিগুলোকে চেনা ও এদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি চিহ্নিত করা আমাদের প্রথম কর্তব্য। তার থেকেও বেশি এই শক্তিগুলোর পিছনে যে বিচারধারা কাজ করে তা আমাদের জানতে হবে |
প্রথমে আমরা শুনে নিই এই দ্বিতীয় প্রবাহের মানুষদের খবরা খবর। এই দ্বিতীয় প্রবাহের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হচ্ছে মাহিষ্য বা কৈবর্ত জাতি | এই জাতি দুই বাংলা যথা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ মিলিয়ে সবচেয়ে প্রাচীন জাতির মধ্যে একটি জনসংখ্যার নিরিখে দুই বাংলা মিলিয়ে দুই কোটির উপরে | এই জাতির এক মহীয়সী নারীর নাম রানী রাসমণি দেবী যার দক্ষিণেশ্বর মন্দির কে আধুনিক হিন্দুত্বের আতুর ঘর বলা চলে। এই জাতি শিক্ষায় দীক্ষায় কিছুটা এগিয়ে গেলেও সামাজিক অস্পৃশ্যতার জন্য দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয় | এই জাতির এক কৃতি পুরুষ আলামোহন দাস এর তৈরি কলকারখানা বাম আমলে ভেঙে নষ্ট করে দেওয়া হয়। এই জাতি পশ্চিমবাংলায় বাম আমলে সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত এবং বলা চলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা হয়। এই জাতি যেই দুর্বল হয় সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। এই জাতির বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী আন্দামানের কারাগারে বন্দি ছিল এবং মৃত্যুবরণ করেছিল। বসন্ত বিশ্বাস এই জাতিরই এক বীর সন্তান | এই জাতি শুধু কৈবর্ত নামে মন্ডল কমিশনের রিপোর্টে নথিভুক্ত ছিল | কিন্তু মাহিষ্য ও কৈবর্ত দুইটি একই জাতি কিন্তু জনসংখ্যার কিছু মাত্র অংশকে সংরক্ষণ দেওয়া হয় এবং অধিকাংশকে উপেক্ষা করা হয় | প্রত্যেকবার ভোটের সময় সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা দেওয়া হয় বাংলাদেশ থেকে আগত জিহাদী এবং জামাতিদের | অতিরিক্ত পরিশ্রমি এই জাতি নদিয়া, নর্থ ২৪ পরগনা, সাউথ ২৪ পরগনা এবং মেদিনীপুর পুরুলিয়াতে জনসংখ্যার হিসেবে সর্বাধিক |
বাংলার আরেকটি পিছিয়ে পড়া জাতি হচ্ছে সদগোপ | গোপেদের একশ্রেণি সদগোপেরা বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতিকরণে বাংলাকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে, যার ফসল এখনো একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতারা খেয়ে যাচ্ছে। আদি বাংলায় সদগোপেরা একটি উন্নত জাতি ছিল এবং বাংলার বহু এলাকায় তারা জমিদারি, দুগ্ধ চাষ এবং দুগ্ধপণ্য উৎপাদনে, বাংলাকে স্বনির্ভর করেছিল | এই জাতি বাংলাকে শিল্প বিপ্লবের মাঝখানেও কখনো পিছিয়ে দেয়নি। বাংলার লড়াকু এই জাতির এক মহীয়সী-র নাম রানী শিরোমনি, যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে হিজলি কারাগারে বন্দী ছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন | এ জাতির আরেক অগ্রজ পুরুষের নাম মহেন্দ্রলাল সরকার যিনি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কালটিভেশন অফ সাইন্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন | পশ্চিমবঙ্গের এই বীর জাতি মন্ডল কমিশনে পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে নথিভুক্ত হলেও আজও পর্যন্ত সংরক্ষণ পায়নি এবং এখন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক । কিন্তু বাংলাদেশী জিহাদীরা এই মুহূর্তে এই সংরক্ষণ পায়।
শিবের দ্বারা স্থাপিত তেলি সম্প্রদায় আজ পশ্চিমবঙ্গে আজ বঞ্চিত জাতিদের মধ্যে বোধহয় সবথেকে পিছিয়ে | তেল ব্যবসার সাথে জড়িত এই সমাজ আজকে, বাম আমল থেকে আরো শিরদাঁড়া হীন একটি সমাজে পরিবর্তন করেছে | এই জাতি শুধু পরিশ্রমের দ্বারা আজ সরকারি এবং বেসরকারি সংগঠনগুলিতে, বিভিন্ন পদে থাকলেও, সংখ্যার হিসেবে সবথেকে নিচে, শুধুমাত্র সংরক্ষণ পায়নি বলে | এই জাতির স্বাধীনতা বিপ্লবীদের কোনদিনও সামনে আসতে দেওয়া হয়নি। ভগবত প্রসাদ সাহু , ভগবান সাহুর মতো বলিদানকারীদের আজ শুধু ২০১৪ সালের জাতীয়তাবাদী সরকার একমাত্র স্বীকৃতি দিয়েছে | মন্ডল কমিশনে এই জাতি পিছিয়ে পড়া জাতির মধ্যে সূচিত হলেও এখনো সংরক্ষণ পায়নি এবং শিক্ষাদীক্ষায় চাকরি পিছিয়ে আছে |
পশ্চিমবঙ্গে প্রান্তিক জাতিগুলি যেমন বাউরী, বাগদি, কর্মকার নমঃশূদ্র, নাপিত, হরিজন সংরক্ষণ পেলেও তার সদ্ব্যবহার কোনদিনই সম্ভব হয়নি | এর একটি বড় কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনীহা | আমাদের বুঝতে হবে যে এই অনীহার কারণ কি? ৬০ দশকের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে তারা যাদের ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তাই জাতীয়তাবাদী বোধ, এই রাজনৈতিক নেতৃত্বদের মধ্যে কোনদিনও ছিল না | এনাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের খিদে মেটাবার জন্য পশ্চিমবঙ্গের ধ্বংস উত্তীর্ণ করা | এনারা দলিত জাতির কোন মানুষকে রক্ষা করেননি। কিন্তু পরে যখন পূর্ব পাকিস্তানে জিহাদি কুকুরদের অতিরিক্ত অত্যাচারে দলিত মানুষেরা দলে দলে পশ্চিমবঙ্গে আসতে থাকেন তখন এই প্রবঞ্চকেরা তাদের ধরে ধরে খুন করে। এই প্রবঞ্চকদের নেতা ছিলেন বামেদের সর্বেসর্বা দলিত খুনি মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু | মরিচঝাঁপি দ্বীপে ইনি দলিতদের ওপর পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা এবং গণধর্ষণ পরিকল্পনা, সম্পাদিত এবং কার্যকর করেন | ধর্ষণকে ইনি রীতিমতো একটি শিল্প পর্যায় নিয়ে গেছিলেন | সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামে ধর্ষণকে শিল্পায়ন করেন বামেদের আরো একজন নরখাদক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। আর রেট চার্ট করে বিক্রি করেন ২০১১ সালে বাম বিরোধী ভোটে জেতা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী , যার প্রমাণ সন্দেশখালি | সমস্যা হচ্ছে, এই দুয়ারে ধর্ষণ প্রকল্পের লক্ষ্য কিন্তু সেই প্রান্তিক, গরিব দলিত পরিবারের মেয়ে বউয়েরা | একটা জিনিস লক্ষ্য করে দেখবেন | পশ্চিমবঙ্গের তিনটি বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়, যথা যাদবপুর, কলকাতা এবং আইএসআই কলকাতা, কিন্তু যখন দলিতদের নিপীড়ন অত্যাচার হয় তখন আশ্চর্যজনকভাবে এরা চুপ থাকে। এরা চিৎকার চেঁচামেচি তখনই করে, যখনই এই দলিত নিপীড়িত জাতিগুলি হাতে লাঠি তোলে | তখন এদের ভেতরে গান্ধী জেগে ওঠে এবং লাঠি নামাতে তৎপর হয়ে ওঠে | তখন এই নিপীড়িত জাতিদের দাঙ্গাবাজ বলে প্রতিঘাত করতেও এদের বিবেক দংশন হয় না | প্রশ্ন হচ্ছে আর কত দমন? আর কত নিপীড়ন? আর কত খুন? আর কত ধর্ষণ? তাহলে দেশের সংসদ রা, আইনজীবীরা আইন রক্ষকরা, জাজেরা চোখ তুলে তাকাবেন।
No comments:
Post a Comment